করোনা সঙ্কটে রুহিয়ায় আধা মণ বেগুনে ১ কেজি চাল!
প্রকাশ : ২৩-০৪-২০২০ ১৯:৪৫
নিজস্ব প্রতিবেদক
গৌতম চন্দ্র বর্মন, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি : প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের কারণে সবজি চাষিদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। দুর্ভিক্ষকে আলিঙ্গন করতে ইশারায় ডাকছে রুহিয়ার কৃষকের সোনালি স্বপ্ন?
গায়ের ঘাম পানি করে ক্ষেতে সবজি চাষ করে ভরে তোলেন রুহিয়ার চাষিরা। এভাবেই জীবিকার চাকা সচল রেখেছেন রুহিয়ার হাজার হাজার কৃষক পরিবার। কেউ নিজের জমিতে, কেউ বর্গা নিয়ে বিশাল এলাকাজুড়ে করেছেন বিভিন্ন জাতের সবজি বাগান। এসব সবজি ক্ষেতে শ্রম বিক্রির টাকায় সচল ছিল হাজারো দিনমজুরের সংসার। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়ার সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে চলে যায় রাজধানীসহ সারাদেশের বড় বড় বাজারে।
সারাদেশের চাহিদাকে বিবেচনায় রেখে চলতি মৌসুমেও বিভিন্ন জাতের সবজি চাষাবাদ করেছেন জেলার চাষিরা। চাষিদের মাঠ ভরে আছে করল্লা, শশা, বেগুন, শিম, বরবটি, লাউ, টমেটো, গাজর, মিষ্টিকুমড়াসহ নানান সবজি ও শাকে। মৌসুমের শুরুতে দাম ভাল পেয়ে বেজায় খুশি হলেও তা স্থায়ী হয়নি। বিশ্বের সেই প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস এসে মুহূর্তেই চুরমার করে দিয়েছে সবজি চাষিদের স্বপ্ন। ক্রেতার অভাবে মাঠেই নষ্ট হচ্ছে চাষিদের সবজি।
করোনাভাইরাস সংক্রমণরোধে সরকার দেশকে অঘোষিত লকডাউন করেছে। ফলে বড় বড় মোকামে সবজির চাহিদা ও ক্রেতা নেই। তাই ব্যবসায়ীরাও সবজি কিনতে চাষিদের মাঠে ভিড়ছেন না। স্থানীয় বাজারেও চাহিদার তুলনায় যোগান বেশি হওয়ায় দামও নেই বললেই চলে। ফলে মুনাফা তো দূরের কথা ক্ষেতের সবজি সংগ্রহ ও পরিবহন খরচও উঠছে না। তাই ক্ষেতেই পচে নষ্ট হচ্ছে চাষিদের লালিত স্বপ্ন।
রুহিয়ার সবজি এলাকাখ্যাত ১৪ নং রাজাগাঁও ইউনিয়নের বড়দেশ্বরীহাটের বর্গা নেয়া কৃষক বেলাল হোসেন এ বছর লাভের আশায় ৭০ হাজার টাকা খরচ করে ২ একর জমিতে মিষ্টি কুমড়া, ভূট্টা ও মরিচ চাষ করেছেন। কিন্তু সবজি বিক্রির শুরুতেই হঠাৎ করোনার ছোবলে লকডাউন হওয়ায় দরপতন ঘটে। এতে প্রতিমণ ৬ শ' টাকা দরের সবজি এখন বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৫০ টাকায়। এতে শ্রমিকের খরচও উঠছে না তার। ফলে সবজির পরিচর্যা বন্ধ করেছেন তিনি। ফসলের লোকসানসহ পরিবারের খাদ্যাভাব নিয়ে বড্ড চিন্তিত এ চাষি।
দক্ষিণ বঠিনা গ্রামের কৃষক মলিন চন্দ্র কিছুদিন আগেও ক্ষেতেই করল্লা বিক্রি করেছেন প্রতিমণ দুই হাজার টাকায়। এখন তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র তিনশত টাকায়। তিনি জানান, করল্লা ক্ষেত থেকে সংগ্রহ করা শ্রমিকের খরচও উঠছে না। অন্যের এক বিঘা জমি লিজ নিয়ে সবজি চাষ করে লোকসানের মুখে পড়েছি।' লিজের টাকা ও পরিবারের খরচ যোগান নিয়ে বড্ড চিন্তায় রয়েছেন এ বর্গাচাষি।
ধর্মপুরের সবজি ক্ষেতের দিনমজুর দিলিপ, রবিন, ও বুধো বেওয়া সারাবছর দৈনিক তিনশ' টাকা মজুরিতে সবজি ক্ষেতে কাজ করেন। এখন সবজির দাম নেই, লোকসানের কারণে মালিক কাজে ডাকেন না এবং করোনার প্রভাবে সরকার বাইরে না যাওয়ায় নির্দেশ দেওয়ায় তারা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
ক্রেতার অভাবে চলতি মৌসুমে জমির বর্গা নেওয়া টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করছেন দক্ষিণ বাঠিন গ্রামের সবজি চাষি আব্দুল আলী। তিনি বলেন, বর্গা নিয়ে ১ বিঘা জমিতে চাষ করা দেশিজাতের বেগুন প্রথম দিকে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেও এখন দুই টাকা কেজিতে বিক্রি করতে হচ্ছে। আর ২০ কেজি বেগুন বিক্রি করে নিতে হচ্ছে ১ কেজি চাল। তারও ক্রেতা নেই। ফলে মাঠেই পচে নষ্ট হচ্ছে। কেউ কেউ গরু ছাগলের জন্য কিনছেন।
পাটিয়াডাঙ্গী বাজারের গ্রাম্য চিকিৎসক অবশ্য আশার বাণী শোনাচ্ছেন। করোনা দুর্যোগ স্থায়ী হলে চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। তাই বর্তমান লোকসান হলেও স্বাস্থ্যবার্তা মেনে সবজি ক্ষেতের পরিচর্যার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে এসব বর্গাচাষিদের প্রণোদনাসহ করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় তাদের সহায়তা দিতে সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি।
-- বিজ্ঞাপন --
CONTACT
ads@thakurgaon71.com